অচেনা স্টেশনের শেষ যাত্রী

 


অচেনা স্টেশনের শেষ যাত্রী

শহর থেকে গ্রামের বাড়ি ফেরার পথে রাতটা বেশ গভীর হয়ে গিয়েছিল। অঞ্জন যখন ছোট স্টেশনটায় নামল, তখন ঘড়িতে রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। কুয়াশায় চারপাশটা ঝাপসা, প্ল্যাটফর্মের টিমটিমে আলোগুলো যেন অন্ধকারের সাথে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

স্টেশনে অঞ্জন ছাড়া আর কোনো যাত্রী ছিল না। দূরে একটা কুকুর একটানা ডেকে যাচ্ছিল, যা পরিবেশটাকে আরও থমথমে করে দিচ্ছিল। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে অঞ্জন যেই একটু এগোতে যাবে, হঠাৎ দেখল একেবারে শেষ মাথার বেঞ্চিতে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। পরনে ধবধবে সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি, হাতে একটা পুরনো দিনের কাঠের ছড়ি।

অঞ্জন ভাবল, হয়তো কোনো গ্রামবাসী। সে ভদ্রতা করে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, এই স্টেশনের বাইরে কি কোনো রিকশা বা ভ্যান পাওয়া যাবে এখন?"

বৃদ্ধ মুখ তুললেন না, নিচু স্বরে বললেন, "সবাই তো ফিরতে চায় না, কেউ কেউ থেকে যেতে চায়। তুমি ফিরে যেতে চাও কেন?"

কথাটা শুনে অঞ্জনের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত পা চালাল স্টেশনের বাইরে বেরোনোর জন্য। কিন্তু স্টেশনের গেটটা পার হতেই দেখল—সামনে কোনো রাস্তা নেই। কেবল ঘন জঙ্গল আর ধোঁয়াশা।

সে অবাক হয়ে পেছনে ফিরল স্টেশনে আবার ঢোকার জন্য। কিন্তু পেছনে ফিরতেই তার হাত থেকে ব্যাগটা পড়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড আগে যে স্টেশনে সে ছিল, সেখানে এখন কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই, কোনো আলো নেই। আছে শুধু শ্যাওলা ধরা পুরনো এক ধ্বংসাবশেষ।

হঠাৎ অঞ্জনের কানের কাছে সেই বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "ট্রেন থেকে ভুল জায়গায় নেমে পড়েছ বাপু, এখান থেকে ফেরার কোনো রাস্তা নেই।"

অঞ্জন চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু দেখল তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। দূরে সেই পুরনো স্টেশনের ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় রাত বারোটা দশ মিনিট।

Post a Comment

Previous Post Next Post